রবিবার ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১১:১০
রমজানের অপার সম্ভার কাজে লাগানোর শর্ত এই মাসকে জানা ও গভীরভাবে অনুধাবন করা

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মদ শাহী আরাবলু বলেছেন, পবিত্র রমজান মাস আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার, হৃদয়কে সজীব করার এবং মানুষকে বন্দেগির সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার এক অতুলনীয় সুযোগ।

তেহরানে হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে পাঞ্চাতন-এ-আলে আবা (আ.)-এর ধর্মীয় বিদ্যালয়ের প্রধান রোজার বিশেষ প্রভাব ও এর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এ কথা বলেন।

রমজানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
তিনি বলেন, বছরের অন্যান্য মাসের মধ্যে পবিত্র রমজান মাসের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা এই মহান মাসের আধ্যাত্মিকতার অফুরান সমুদ্র থেকে আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুঁজি সংগ্রহ করতে পারি।

তিনি উল্লেখ করেন, রমজান মাসের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো এই মাসের নামকরণ। ইসলামের আগেও আরব ও আরব উপদ্বীপে ‘রমজান’ নামটি প্রচলিত ছিল এবং তারা এতে বিশ্বাস করত। ‘রমজান’ শব্দটি ‘রামাদা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পরিষ্কার করা, মুছে ফেলা ও নির্মল করা।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, আরবরা শরতের শুরুতে মাটিতে বর্ষিত বৃষ্টিকে ‘রামাদা’ বলে, কারণ এই বৃষ্টি বসন্ত ও গ্রীষ্ম পার হয়ে আসার পর নেমে আসে এবং সমগ্র প্রকৃতিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে, পাহাড়-মাঠ থেকে ধুলোবালি সরিয়ে দেয়।

রাসুলের (সা.) হাদিসে রমজানের মর্যাদা
পাঞ্চাতন-এ-আলে আবা (আ.)-এর ধর্মীয় বিদ্যালয়ের প্রধান বলেন, এই উপমা দিয়ে আমরা এই মাসের মূল্যবোধের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি। তাই রমজান মাস হচ্ছে সময়কে পবিত্র করার এবং মানুষের রূহ ও হৃদয়ের ঘর-সংসার পরিষ্কার করার মাস। রাসুলে ইসলাম (সা.) বলেছেন, রমজানের শুরুতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়, মাঝখানে মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং শেষ দিকে রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি। যে ব্যক্তি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই মাসের যত্ন নেয় এবং নিয়ামতে ভরা এই দস্তরখান থেকে উপকৃত হয়, সে আল্লাহর মাগফিরাত ও ক্ষমা লাভ করে। আর এই মাসের শেষ দিকে দোয়া কবুল হয়। সুতরাং রাসুলের (সা.) এই ছোট্ট হাদিসই এই মাসের মর্যাদা বুঝতে যথেষ্ট।

রমজানের সম্ভার কাজে লাগানোর শর্ত কী
তিনি রমজানের সম্ভার কাজে লাগানোর শর্ত হিসেবে এই মাসকে জানা ও চেনার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, যারা রোজা রাখে না, তারা মূলত এই মাসের মহান মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন নয়। রাসুলে ইসলাম (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, এই মাসকে রমজান বলা হয়, কারণ এ মাসে গোনাহ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়।

হুজ্জাতুল ইসলাম শাহী আরাবলু স্মরণ করিয়ে দেন, এ মাসে আল্লাহ আমাদের এক অভাবনীয় সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘এ পর্যন্ত যা করার করেছ। এখন আমার হাত দুটি প্রসারিত। যদি তুমি বদলে যেতে চাও, ওঠো এবং এই সুযোগ কাজে লাগাও।’ মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অনুগ্রহ ধারাবাহিক এবং সর্বদাই তাঁর রহমতের ছাতা আমাদের ওপর প্রসারিত।

যে হাদিসে কুদসি রোজার মাহাত্ম্য বোঝায়
পাঞ্চাতন-এ-আলে আবা (আ.)-এর ধর্মীয় বিদ্যালয়ের প্রধান রাসুলে ইসলাম (সা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে কুদসির উদ্ধৃতি দিয়ে এই মাসের পবিত্রতা তুলে ধরে বলেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি রোজা রাখে, তার দেখা উচিত সে কার সঙ্গে লেনদেনে প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, এই মাসের বিশেষ বরকত মানুষের হৃদয় ও প্রাণকে সজীব করে তোলে। মানুষ শুধু জড় পদার্থ নয় যে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, রাগ, চাহিদা আর পশুজীবন যাপনের জন্য এই দুনিয়াতে এসেছে। রমজান আসলে বছরের অন্যান্য মাসের মধ্যে এমন একটি মাস, যা মানুষের হৃদয় ও প্রাণকে সজীব করে।

পিছিয়ে পড়াদের জন্য জ্বালানি ভরার সুযোগ
হুজ্জাতুল ইসলাম শাহী আরাবলু বলেন, যারা পথ চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে এবং পথের মাঝখানে পিছিয়ে পড়েছে, তাদের জন্য রমজান হচ্ছে জ্বালানি ভরার সুযোগ। মহান আল্লাহ এই সুযোগ দিয়েছেন যেন আমরা রোজা, নামাজ এবং এ মাসের বিশেষ দোয়া যেমন দোয়া-এ-ইফতিতাহ পড়ে নিজেদের খুঁজে পেতে পারি। কারণ মানুষ প্রকৃতির মধ্যে এক বিস্মৃত সত্তা এবং কখনো কখনো নিজেকেই ভুলে যায়। তাই রমজান মানুষের জন্য এক বিশেষ সুযোগ, যাতে তারা নিজেদের অস্তিত্বে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে।

শুধু মুখ নয়, হৃদয়ও যেন রোজা থাকে
তিনি আরও বলেন, হযরত আলী (আ.) বলেছেন, রমজান মাসে শুধু তোমার মুখ নয়, তোমার হৃদয়কেও রোজাদার রাখার চেষ্টা করো। সুতরাং আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, এই মাসের রোজা ও ওয়াজিব আমল তথা 'সওমুল কালব'-ই হলো প্রাণের পুনর্জীবন লাভ।

তিনি বলেন, এ মাসে আমাদের জবানের যত্ন নেওয়া উচিত। জবান যেমন গোনাহের বড় হাতিয়ার, তেমনি মানুষের মূল্যায়ন ও সেবা পৌঁছে দেওয়ারও বড় মাধ্যম।

গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ
পাঞ্চাতন-এ-আলে আবা (আ.)-এর ধর্মীয় বিদ্যালয়ের প্রধান এ মাসের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের সাহায্য করার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ মাসে সদকা দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তাই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের উচিত খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া, যাতে তাদের ঘরও আল্লাহর নিয়ামতে শূন্য না থাকে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha